আধুনিক পৃথিবীতে ইসলামি আন্দোলনের রাজনৈতিক গুরুর ভূমিকায় একজন হাসানুল বান্নার গুরুত্ব অপরিসীম। মাত্র ২৮ বছর বয়সে তরুণ স্কুলশিক্ষক হাসানুল বান্না একালের সবচেয়ে প্রভাবশালী মুসলিম সংগঠন ইখওয়ানুল মুসলিমিন প্রতিষ্ঠা করেন, যা পৃথিবীব্যাপী মুসলিমদের জন্য নতুন এক সংগ্রামের পথরেখা তৈরি করে দেয়। অনুবাদকের ভাষায়—’ইখওয়ানুল মুসলিমিন ও এর প্রতিষ্ঠাতা হাসানুল বান্না রাহি.-কে বাদ দিয়ে বিংশ শতাব্দীর ইসলামি ইতিহাস কল্পনা করাও দুষ্কর। ইসলামি আন্দোলনের সাথে জড়িত বিশ্বের নওজোয়ানদের নিকট তাকে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই।’ উনবিংশ শতাব্দীতে মুসলিম উম্মাহর দুর্গতি ও দুর্দশায় ব্যথিত হয়েছেন এমন লোকের হয়তো অভাব নেই; কিন্তু দুর্দশাগ্রস্ত জাতির সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করে রাজপথে রক্তমাখা সংগ্রাম যারা করেছেন, তাদের মধ্যে হাসানুল বান্নার নাম প্রথম সারিতে। অথচ বাংলাভাষায় তার জীবনভিত্তিক কাজ একদম নেই বললেই চলে। এই মহান মনীষীর জীবন ও কর্মকুশলতায় রয়েছে প্রতিটি মুসলিম ও মুমিনের জন্য ত্যাগ ও সংগ্রামের পাথেয়, রয়েছে বিজয়ীদের জন্য এক সুবর্ণ পথরেখা। বাংলাভাষার এই শূন্যতা ঘোচাতেই ‘শহীদ হাসানুল বান্না রাহি. জীবন ও কর্ম’ গ্রন্থের প্রয়াস! বক্ষ্যমাণ গ্রন্থের শুরুতেই রয়েছে তার জন্ম, প্রাথমিক জীবন, ও প্রথমদিককার জীবনের পড়াশোনা। অতঃপর কিশোর বান্না কীভাবে সুফিবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যান তারও গল্প। ইখওয়ানুল মুসলিমিন প্রতিষ্ঠা করার আগের দিনগুলোতে শহরের যেসব কফিশপগুলো ছুটির দিনগুলিতে লোকে লোকারণ্য হয়ে যেত, বান্না সেসবে সপ্তাহে দুইবার করে ভাষণ দিতেন। সেখানে মানুষকে দ্বীন ও বস্তুবাদের ফারাক বোঝাতে বোঝাতে একসময় নিজেই উপলব্ধি করলেন, এই কথাগুলো গণআন্দোলনের মতো সংগ্রামমুখর ভূমিকায় পুরো মিশরে ছড়িয়ে দেওয়া দরকার। সেই থেকেই ইখওয়ানুল মুসলিমিন তৈরির পরিকল্পনা তার মাথায় আসে। এরপর রয়েছে—একের পর এক বান্নার বৃহৎ কর্মজীবনের গল্পগুলো; অসংখ্য মাদরাসা প্রতিষ্ঠা, বিভিন্ন সংগঠন ও শাখা-সংগঠন তৈরি, বিভিন্ন জনপদে ইখওয়ানের কেন্দ্র স্থাপন ও বান্নার দেশব্যাপী ভ্রমণের বিবরণ। অতঃপর হাসানুল বান্নার বিবাহ, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ও গ্রেফতারির দৌরাত্ম্য নিয়েও ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো একের পর এক তুলে ধরা হয়েছে বইয়ে। মিশর ও বিশ্বের মুসলিমদের সামগ্রিক দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা দেখে বান্নার সংবেদনশীল মন বারবার কেঁদে উঠত। সেজন্য তিনি মুসলিমবিশ্বের শাসকদের নিকট অনেক ঐতিহাসিক পত্র লিখেছিলেন। বইয়ে রয়েছে সেসব চিঠিরও সারসংক্ষেপ। এরপর রয়েছে তার সময়কার নির্বাচন, ইখওয়ানের দুই ভাগ হয়ে যাওয়া, বান্নার গ্রেফতারি এবং ইখওয়ানের সশস্ত্র সংগ্রামের দিনলিপি ও বান্নার শাহাদাত। ছোট্ট অথচ মৌলিক, তত্ত্ব ও তাত্ত্বিকতায় ভরপুর এ বইতে হাসানুল বান্নার জীবন থেকে শেখার মতো অনেক বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। উল্লেখ হয়েছে তার সুন্নত ও জুহদময় জীবন, দাওয়াতের ক্লাসিকাল পদ্ধতি, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও মানুষের হৃদয়ে কীভাবে দ্বীনের প্রভাব ফেলতেন, সেসবের কৌশলি বয়ান। পরিশেষে রয়েছে হাসানুল বান্না সম্পর্কে বিশ্বের কয়েজন বড় বড় আলেমের মন্তব্য। এ তালিকায় রয়েছেন আবুল হাসান আলি নদভি রাহি., শায়খ আলি তানতাভি রাহি., ড. ইউসুফ কারজাভি ও এরকম আরও কয়েকজন বড় আলেম। উপসংহারে রয়েছে হাসানুল বান্নার রাহি.-এর কিছু উপদেশ, তার রচনাবলির পরিচয় ও তার শহিদি মৃত্যু নিয়ে একটি যৌক্তিক আলোচনা। মোদ্দাকথা, হাসানুল বান্নার সমগ্র জীবনকে একটি ধারাবাহিক পাঠের ভিতর দিয়ে সাজানো হয়েছে বইটিতে, যেন পাঠক বইটি পাঠশেষে একটি দৃশ্যমান বাস্তবতাকেন্দ্রিকভাবে বান্নার জীবন সম্পর্কে ধারণা পান। একালের সবচেয়ে গ্রেট ইসলামি আন্দোলনের রূপকার হাসানুল বান্না রাহি.-এর জীবন ও সংগ্রামের দিনলিপি সম্পর্কে জানতে মূল্যবান এ বইটি সংগ্রহে রাখতে পারেন।