বইটি সম্পর্কে লেখক আরিফ আজাদ ভাইয়ের অভিমত- আজকে পড়ছিলাম ইবন রজব হাম্বল (রহঃ) এর ‘সালাফদের ইলমী শ্রেষ্ঠত্ব’ বইটা। খুব ছোট বই। লেখক, অনুবাদক আর প্রকাশকের কথা বাদ দিলে সর্বসাকুল্যে পঞ্চাশ পৃষ্ঠার মতোন হবে। কিন্তু এই পঞ্চাশ পৃষ্ঠার প্রতিটি লাইন যেন আমার গর্ব, অহঙ্কার, আমার দাম্ভিকতা, অহমিকা সব গুঁড়িয়ে দিচ্ছিলো। ‘জেনে ফেলেছি’, ‘বুঝে ফেলেছি’ ‘শিখে ফেলেছি’ আর ‘আমি যা মানি সেটাই ঠিক’, ‘আমি যেটা বুঝি সেটাই ঠিক’ টাইপের যে ব্যামোগুলো এতোদিন নিজের মধ্যে কাজ করতো, সেগুলোকে যেন মূহুর্তেই ধূলিসাৎ করে দিয়ে গেলো প্রতিটি লাইন। আমি ভুলতে বসেছিলাম জ্ঞান সমুদ্রে আমি নিতান্তই এক বিন্দু জলের ন্যায়। আমার জানার পরিধি সেই একটি বিন্দুর কয়েক মিলি ভাগের এক ভাগের সমানও না। এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জ্ঞান আমাকে যেরকম অহংকারী করে তুলেছিলো, আমার দাম্ভিকতাকে যে উচ্চাসনে নিয়ে গিয়েছিলো, বইটি আমাকে সেখান থেকে আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করেছে। . বইটিতে ইমাম আবু দাঊদের একটি সুন্দর উক্তি আছে। তিনি বলেছেন,- ‘সাহাবা (রাঃ) দের মধ্যে ইবন আব্বাস একটু বেশিই মন্তব্য করতেন। এর মানে এটা নয় যে ইবন আব্বাস আবু বকর (রাঃ) এবং ওমর ফারুক (রাঃ) দের চেয়ে বেশি জানতেন। বরং আবু বকর এবং ওমর ফারুক (রাঃ)-রাই ইবন আব্বাসের চেয়ে বেশি জ্ঞান রাখতেন। কিন্তু তারা বলতেন কম। চুপ থাকতেন বেশি। আবার, সাহাবা (রাঃ) দের চেয়ে তাবেয়ীগন বেশি কথা বলতেন। এর মানে এই নয় যে, সাহাবাদের চেয়ে তাবেয়ীগন বেশি জানতেন। সাহাবারা নিঃসন্দেহে বেশি জানতেন, কিন্তু বলতেন কম। আবার, তাবেয়ীগনের চেয়ে তাবে-তাবেয়ীগন বেশি বলতেন। এর মানে এই নয় যে তাবেয়ীগনের চেয়ে তাঁরা বেশি জ্ঞান রাখতেন। বরং তাবেয়ীগনই বেশি জ্ঞান রাখতেন। কিন্তু তাঁরা বলতেন কম। চুপ থাকতেন। অর্থাৎ, জ্ঞানীদের একটা বৈশিষ্ট্য হলো বিতর্ক না করে চুপ থাকা’। আমাদের সমাজে এখন আমরা যারা তালেবে ইলম (জ্ঞান অন্বেষণকারী) আছি, তাদের মধ্যে এইটা বেশিই কাজ করে। সময় হচ্ছে আল্লাহ তা’লার বিশেষ একটা নিয়ামাহ আমাদের জন্য। প্রতিটা সময় আমাদের মৃত্যুর নিকট থেকে নিকটবর্তী করে। অথচ, এই মহামূল্যবান সময়গুলো আমরা অনলাইনে ব্যয় করি কিভাবে? এক মুসলিম আরেকজন মুসলিমের দোষ-ত্রুটি খুঁজে। লা মাযহাবিরা মাযহাবিদের পেছনে, মাযহাবিরা লা মাযহাবিদের পেছনে। একে-অন্যকে এমনভাবে আর এমন ভাষায় আক্রমণ করে বসি যে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে সেটা ভদ্রতা, শিষ্টাচারের লেভেল ক্রস করে চলে যায়। অপেক্ষায় থাকি কার কখন কোন মন্তব্য আমার অপছন্দ হবে আর সেটার স্ক্রিনশট করে জায়গায় জায়গায় পোস্ট দেওয়া এবং এর-ও’র ইনবক্সে দিয়ে বেড়ানো আর বলে বেড়ানো যে- ‘দেখেছেন? এতোদিনে থলের বেড়াল বেরুলো। বলেছিলাম না এই লোক আমাদের মানহাযের না? সে অমুক মতাবলম্বী। অতএব, সে ইসলাম থেকে খারিজ’। ব্যস! এবার তাঁর বিরুদ্ধে দলবল নিয়ে নেমে পড়া এবং জায়গায় জায়গায় তাকে হেয় করা, হেনস্থা করা। অথচ এই যে পরনিন্দা, গীবত আর বিদ্বেষ ছড়িয়ে যে সময়গুলো আমরা নষ্ট করি, এই সময়গুলো কতো প্রোডাক্টিভ সাইডে ব্যবহার করা যেতো। কতো কিছু পড়া যেতো, জানা যেতো। সালাফদের সাথে আমাদের মেজর একটা গ্যাপ এখানেই। উনারা জ্ঞানার্জন করেছেন আমল করার জন্য, আমরা জ্ঞানার্জন করি আমার মতের বিরুদ্ধে থাকা ব্যক্তিকে বিতর্কে হারানোর জন্য। আপসোস! এই যে নিজের জানার আর বোঝার বড়াই, অহংকার, এইটা আমাদের সময়ের জন্য বিশাল একটা ফিতনা। এই ফিতনার সময়ে আমাদের জ্ঞানার্জন আর সেগুলোর ব্যবহারিক পদ্ধতি কেমন হতে হবে সেটা জানার জন্য ‘সালাফদের ইলমী শ্রেষ্ঠত্ব’ বইটা অবশ্য পাঠ্য একটা বই। আল্লাহ লেখককে কবুল করুন, আ-মী-ন।