তৃতীয় সহস্রাব্দের কিয়ামত গ্রন্থটি জনাব আব্দুল আজিজ মোস্তাফা কামিলের অসাধারণ এক রচনা। জনাব আব্দুল আজিজ জামে আল-আজহারের ইসলামিক স্টাডিজ কলেজ থেকে ডক্টরেট অর্জন করেন। বর্তমানে সৌদি আরবের কিং সউদ ইউনিভার্সিটির ট্রেনিং কলেজে ইসলামী সংস্কৃতি বিভাগের লেকচারার। তাঁর প্রণীত গ্রন্থের উর্দূ তর্জমা যিনি করেছেন, তিনি বিশ্ববরেণ্য ইসলামী বুদ্ধিজীবি সাইয়্যিদ আবুল হাসান আলী নদভীর (রাহ্.) বহুবীদ গুণাবলী ও জ্ঞানগত উত্তরাধিকারের ধারকÑ মওলানা সাইয়্যিদ সালমান আল হোসাইনী নদভী (দা.বা)। তিনি নদওয়াতুল উলামার উস্তাযুল-হাদীস ইসলামী চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তির অঙ্গনে এক বিশ্বব্যক্তিত্ব। ইসলামী দাওয়াত ও চেতনার বিস্তারে তাঁর জযবা ও চিন্তাধারা অনবদ্য। গোটা মুসলিম বিশ্ব, এমনকি বিশ্বমানবতার জন্যে দরদী একটি হৃদয় যেভাবে তাঁকে প্রতিনিয়ত তাড়িত করে, তেমনি মুসলিম জাতিসত্তার প্রতিটি প্রেক্ষাপট ও সমস্যার প্রতি গভীর দৃষ্টিপাত ও প্রতিটি প্রয়োজনের প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করে চলছেন তিনি। এর পাশাপাশি সমকালীন সভ্যতা ও সংস্কৃতি সমূহের গতি-প্রকৃতির ধারাগুলো তাঁর কাছে যেনো হাতের রেখার মতো পরিস্কার।
এই দুনিয়ায় আল্লাহ্ পাকের খেলাফত ও প্রতিনিধিত্বের সূচনা যেভাবে হয়েছে ওহীর আলোয় আলোকিত নবী হযরত আদম (আ.)-এর মাধ্যমে ঠিক তেমনি এর সমাপ্তি হবে ওহীর আলোকধারায় ¯œাত পয়গাম্বর হযরত ঈসা (আ.)-এর পুনরাগমন ও গোটা বিশ্বে খোদার কালাম জারি করে বিশ্বখেলাফত প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। আসমানী সকল ধর্ম মৌলিকভাবে এই বিশ্বাসে অংশীদার। ইহুদীরা এ বিশ্বাসেই অনুপ্রাণিত হয়ে প্রতিশ্রুত নবীর প্রতীক্ষা করছে। খৃস্টানরা প্রতীক্ষা করছে এ বিশ্বাসের। এমনকি বৌদ্ধরা প্রতীক্ষার প্রহর গুণছে তাদের ত্রাণকর্তার। হিন্দুরাও অপেক্ষা করছে কোনো নতুন অবতারের।
ঐশীগ্রন্থে বিশ্বাসী সব ধর্মের বিশ্বজগতের সমাপ্তি আলো আর কালোর চূড়ান্ত ফয়সালাকারী মহাযুদ্ধের পরবর্তী ঘটনা হিসেবে বর্ণিত। সে যুদ্ধে মিথ্যা পরাজিত হবে, জয়ী হবে সত্য। দাজ্জাল আত্মপ্রকাশ করবে এই সময়ে। মানবেতিহাসের সূচনা থেকে শেষ পর্যন্ত দাজ্জালের চেয়ে বড় কোনো ফিতনা আকাশের তলে আত্মপ্রকাশ করেনি। এ ফিতনা সম্পর্কে প্রত্যেক নবী-রাসূল স্ব-স্ব উম্মতকে অবগত করেছেন। সবচে বড় দাজ্জাল, প্রতারণা ও ফাঁকিবাজীর রাজা, সে আসবে ধর্মীয় নেতার রূপ ধরে, নিজেকে সে প্রতিশ্রুত মসীহ বলে দাবী করবে আর ঈসা মসীহ (আ.)-কে আখ্যায়িত করবে দাজ্জাল বলে। তার কাছে অপমন্ত্র আর প্রতারণা কৌশলের এমন সব ভেলকি থাকবে, এর সম্মুখীন হয়ে মানুষের চিন্তাশক্তি পেরেশান হয়ে যাবে। আর বিস্ময়কর চালবাজী অল্প সময়েই এই ধর্মের প্রয়োজনে অনুসারীরা জীবন দিতে প্রস্তুত হয়ে যাবে। এই ধর্মের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় বলেই ইসলামের নাম শুনলেই তারা গোস্ব¦ায় আগুন হয়ে যায়। দেখে শুনে মনে হচ্ছে এ যেনো দাজ্জালের সম্মুখবর্তী বাহিনীর অভিযাত্রা।
দাজ্জালের অগ্রবাহিনীর তৎপরতা মানেই মাহদী (আ.)-এর সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনার চেহারা থেকে অন্ধকারকে সরিয়ে দিতে সেই সম্ভাবনার বাস্তব বিকাশের চেতনায় উম্মাহকে সাজিয়ে দিতে কী কী কর্মসূচী বাস্তবায়ন করতে হবে এর একটি রূপরেখা উপস্থাপন করেছিলেন আল্লামা উবায়দুল্লাহ সিন্ধী (রাহ্.)-এর বন্ধু মওলানা আব্দুল্লাহ আনসারী (রাহ্.) (তিনি ছিলেন কাসিম নানুতুবী (রাহ্.)-এর নাতি) তিনি লিখেছেন- ইমাম মাহদীর (আ.) সাথে সাক্ষাতের পূর্বে এ উম্মতকে তিনটি পর্যায় অতিক্রম করতে হবে।
১. ইসলামের দিকে প্রত্যাবর্তন এবং শরীয়তের মৌলিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ অর্জন।
২. জিহাদের প্রস্তুতি এবং তাতে সর্বোচ্চ ক্ষমতা অর্জন। কেননা ইমাম মাহদীর (আ.) কাছে এতোটা সময় থাকবেনা যে তিনি আমাদের ধর্ম শিখাবেন ও জিহাদের প্রশিক্ষণ দেবেন। তিনি যেই মাত্র আত্মপ্রকাশ করবেন, সাথে হিযবুশ শয়তানের মোকাবেলা ও দাজ্জালের সাথে সম্মুখ লড়াইয়ে অবতীর্ণ হবেন।
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে মুসলিম বিশ্বের সার্বিক পরিস্থিতি বিচারে মওলানা আনসারীর এ উক্তিটির বাস্তবতা বুঝে আসছিলো না। কিন্তু এর পরই দুনিয়ার দিগ-দিগন্তে ইসলামী দাওয়াতের আলো নিয়ে এক মওলানা ইলিয়াস ছড়িয়ে পড়লেন লক্ষ লক্ষ ইলিয়াস হয়ে। চেতনার আগুন হয়ে জ্বলে উঠলেন শায়খ হাসানুল বান্না (রাহ্.)। গর্জে উঠলো মওলানা মওদুদীর কলম। শতাব্দীর মিনারে মিনারে আযান উঠলো ইসলামের দিকে প্রত্যাবর্তনের। জবাবে দুনিয়ার প্রান্তে প্রান্তে উচ্চারিত লক্ষ লক্ষ লাব্বাইক ধ্বনি বাতাসকে মুখর করে তুললো, এবং পাল্টে দিলো তার গতি। জ্বলে উঠলো ফিলিস্তিন, বিস্ফোরিত হলো চেচনিয়া রুখে দাঁড়ালো আফগান শুরু হলো যুদ্ধপ্রস্তুতি জিহাদের প্রশিক্ষণ।