পৃথিবীর বর্তমান জীবনবাস্তবতায় গণমাধ্যমকে একমুহূর্ত অস্বীকারের কোনো সুযোগ নেই। সহজ করে বলতে গেলে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করে যে তিনটি জিনিস : রাজনীতি, অর্থনীতি আর সংস্কৃতি—গণমাধ্যম খোদ সেই তিনটি জিনিসকেই নিয়ন্ত্রণ করে! কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—গণমাধ্যম আমাদের সাথে কতটা বাস্তব সখ্য রাখে! মিডিয়ার যে আধো-ভৌতিক জীবন, তার আসল সত্যের কতটা কাছে পৌঁছাতে পারে মানুষ—তা নিয়েই খানিকটা কেঁচো খোঁড়া হয়েছে ‘গণমাধ্যমের বিচিত্র ভ্রষ্টাচার’ গ্রন্থে। মিডিয়া মূলত এখন সর্বগ্রাসী। এর আয়তন ও পরিধির ভিতর আমাদের জীবন, সমাজ, কালচার, দেশ, রাজনীতি─সব এমনভাবে ঢুকে পড়েছে যে, এর থেকে বাইরে আসার কারুরই আর কোনো সুযোগ নেই। প্রথমে প্রিন্ট মিডিয়া, তারপর ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া; এরপর যখন ইন্টারনেট এলো, তখন নিমিষেই সব বদলে যেতে শুরু করল! আমাদের আধুনিক কর্পোরেট জীবনের সব কিছু একে একে দখল করে নিলো ইন্টারনেটের রঙিন দুনিয়া। কিন্তু দিনশেষে মিডিয়ার এই চকমকে দুনিয়া আমাদের সাথে কী রকম আচরণ করছে, তা কজনই বা ভেবে দেখেছে? আমাদের জীবন ও সমাজবাস্তবতার মিথ্যা ফিল্টারিং করা যে ভিন্ন এক চলচ্চিত্র সামনে আসে, তা নিয়ে কয়জন আঙুল তুলেছে, বলতে পারেন! বক্ষ্যমাণ গ্রন্থে লেখক এটা নিয়েই বারবার প্রশ্ন তুলতে চেয়েছেন। চশমার কাচে জমে থাকা ময়লাগুলো পরিষ্কার করে পাঠককে দেখাতে চেয়েছেন মিডিয়ার ভেতর ও বাহিরের এমন একটা খোলস, যা আমরা দেখেও দেখি না, কিংবা দেখলেও বুঝতে চাই না। শেষদিকে এর জবাব ও প্রতিকারও বলার চেষ্টা করেছেন বাস্তব জীবনের এমন সব লব্ধ কিছু অভিজ্ঞতা থেকে, যা আপনাকে সত্যের কাছাকাছি পৌঁছুতে সাহায্য করবে। বাংলাদেশের মিডিয়াগুলোর কথা আমাদের অজানা নয়। অদৃশ্য এক মাফিয়াচক্রের হাতে নিয়ন্ত্রিত আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সংবাদের ফিরিস্তি। আমরা দীর্ঘ কাল ধরে দেখেছি, নিজস্ব ফিল্টারিং ছাড়া সহজে কোনো সংবাদ মিডিয়ায় আসে না। কিন্তু কেন? মিডিয়ার তো এরকম প্রতিশ্রুতি ছিলো না! সবাই তো বিজ্ঞাপনে চিৎকার দেয়, মানুষের জন্য আমরা! তাহলে এই চিৎকারটা গিলে খায় কারা? বক্ষ্যমাণ গ্রন্থে এ প্রশ্নের উত্তরটা খোঁজার পাশাপাশি পাঠককে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সেই অদৃশ্য ড্রাকুলার কাছে, যেখানে আমাদের রোজকার জীবনের সত্যগুলা প্রতিনিয়ত বন্দি হয়ে হয়ে একসময় ফিল্টারিং হয়ে যায় মিডিয়ার মতো করে; হয়ে ওঠে তেমন, যা তারা চায়! মিডিয়া থেকে মানুষ আসলে কী শিখছে, সেটাও জরুরি এক আলোচ্য বিষয়। এরপর আছে মিডিয়া আমাদের জীবনকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে, সে ইস্যু। দিনশেষে মিডিয়া যেহেতু আমাদের জীবনে অপরিহার্য এবং একে নিয়েই বাঁচতে হবে, সেজন্য সে প্রশ্নগুলোও বারবার তোলা হয়েছে বইতে। লেখক দীর্ঘদিন কাজ করেছেন দেশের মুলধারার একটি সংবাদপত্রে। সেইসব পথের অলিগলি ঘুরতে গিয়ে যেসব দেখেছেন, বুঝেছেন, উপলব্ধি করেছেন—তারই এক জীবন-ডায়েরি হচ্ছে এই বই। দিনশেষে মানুষ আসলে জীবনের আসল সত্যটা জানতে চায়। কিন্তু এই ফিল্টারিং মিডিয়া তা কি দেখতে দেয়! এমন কঠিন এক প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে পাঠক থমকে গেলে লেখক আশার বাণী শুনিয়ে বলতে চান, এখনো সম্ভব এটা! তিনি বলেন—দেশের দ্বীনদার বিত্তশালী আলেমরা মিলে চাইলেই মানুষের জন্য সত্যিকারার্থেই শক্তিশালী অনেক মিডিয়া বানানো সম্ভব। কেবল দরকার মানুষের সদিচ্ছা। শরীফ মুহাম্মদকে আলাদা করে পরিচয় করিয়ে দেয়ার মতো কিছু নেই। পাঠকমাত্রই জানেন, তিনি প্রাজ্ঞজন। দীর্ঘ দিন সংবাদপত্র ও লেখালেখির জগতে কাটিয়ে নিজের এমন এক ভুবন তৈরি করেছেন, যার ব্যাসার্ধ আয়তনে বিশাল। তার চিন্তা ও চেতনার সামগ্রিক জায়গা জুড়ে রয়েছে মানুষের জন্য কল্যাণকামিতা। গণমাধ্যমের বিচিত্র ভ্রষ্টাচার গ্রন্থে আপনাকে আমন্ত্রণ। বইটি পাঠে আপনার চোখ খুলে যাবে, জন্ম নেবে তৃতীয় চোখ।